নিউজ ডেস্ক
খুব সকালে কয়েকজন শ্রমিক নিয়ে জমিতে গিয়েছিলেন আহাদ মিয়া| পাকা ধান কাটার কথা ছিলো সেদিন| কিন্তু জমিতে পৌঁছে তিনি দেখেন-চারদিকে অথৈই পানি| কোমর সমান পানিতে দাঁড়িয়ে চোখের সামনে পাকা ধান ডুবতে দেখেন তিনি| কিছুক্ষণ এভাবেই নিশ্চুপ তাকিয়ে ছিলেন| হঠাৎই লুটিয়ে পড়েন জমির পাশে| কিছুক্ষনের মধ্যেই সে জমির পাশে মৃত্যু বরণ করেন| একই সঙ্গে অনিশ্চয়তার গভীর অন্ধকারে ডুবে যায় তার পুরো পরিবারে স্বপ্নও।
এখনও আহাদের জমিতে পানি| সেই পানির নিচে ডুবে আছে শুধু ধান নয়- একটি কৃষক পরিবারের সংগ্রাম, পরিবারের থাকার শেষ আশ্রয়, তিন শিশুসহ অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ|
জানা গেছে, আহাদের বাড়ি উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নের রামপুর গ্রামে| পেশায় কৃষক হলেও তিনি গ্রাম থেকে পুরনো জামা-কাপড় সংগ্রহ করে গ্রামের বাজারে বিক্রি করেই চলে তার সংসার| থাকার জায়গা হিসেবে পৌতৃক ভাবে পাওয়া এক শত জায়গার উপর একটি ছোট ভাঙ্গা টিনের ঘর| স্ত্রীসহ তিন সন্তান নিয়ে সেই ঘরে বসবাস করতেন| বাড়ি পাশে মেদির হাওরে এক বিঘা জমি আছে| সে জমির ধান দিয়ে বছরের খাবার চলে| একটু ভাল চলার জন্য স্থানীয়দের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা দিয়ে হাওরের আরও পাঁচ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে আবাদ করেছিলেন এবার| জমি চাষাবাদ করতে গিয়ে এলাকার কিছু ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছ থেকে টাকাও ধার করেছিলেন| যার পরিমাণ প্রায় ৯০ হাজার টাকা| স্বপ্ন ছিল ঘরে পাকা ধান আসলে সে ধান বিক্রি করে ধারের টাকা পরিশোধ করবেন| কিন্তু টানা বৃষ্টি আর উজানের ঢল তার ছয় বিঘা জমির পাাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়|
শনিবার সকালে শ্রমিক নিয়ে জমিতে গিয়ে ছিলেন ধান কাটতে| চোখের সামনে পুরো বছরের খাবারের ধান তলিয়ে যেতে দেখে হঠাৎই তিনি অসুস্থ হয়ে লুটিয়ে পড়েন জমির পাশে| সেখানেই তার মৃত্যু হয়| পরে দুপুরে স্থানীয় একটি কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়|
আহাদের ঘরে এখন কেবলই কান্নার শব্দ| স্ত্রী খুসনাহার বেগম তিন মাসের অন্তঃসত্বা| বাড়িতে তিনটি ছোট সন্তান| আরেকটি নতুন প্রাণ আসছে পৃথিবীতে| তাঁর তিন সন্তানই অবুঝ শিশু| বড় ছেলের বয়সও ৭ বছর| সে রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী| ছোট ছেলে লিটন মিয়া (৫) এখনো ভালভাবে কথা বলাই শিখেনি| আর ছোট মেয়ে নুসরাত বেগম (৩)| নিহতের স্ত্রীর কপালে এখন নতুন চিন্তার ভাঁজ| এখন কীভাবে চলবে সংসার? কীভাবে শোধ করবেন মহাজনের দেনা|
কেবল আহাদ নন| পাকা ধান তলিয়ে যেতে দেখে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন গোয়ালনগর ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামের আরও দুই কৃষক| একজন মো. নজরুল মিয়া অপরজন মো. মিজান মিয়া| নজরুল গোয়ালনগর ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামের জাহের মিয়ার ছেলে| সে বর্গা নিয়ে পুটিয়া বিলে চার বিঘা জমিতে ধান আবাদ করেছেন আর তিন বিঘা জমিতে বাদাম চাষ করেছেন| এর মধ্যে তিনি আশা এনজিও থেকে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন আর ৫০ হাজার টাকা স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে ধার নিয়েছেন|
নজরুল মিয়া বলেন, আমার বাড়ি গাঙ্গের পাড়| এর পাশেই পুটিয়া বিল| এই বিলে চার বিঘা জমিতে ব্রি ২৯ ধান চাষ করছিলাম| আর গাঙ্গের (নদী) পাশে চরে তিন বিঘা জমিতে বাদাম চাষ করছিলাম| শনিবার কামলা (শ্রমিক) নিয়া গেছিলাম ধান কাটতাম| জমিতে পানি দেখে কামলারা (শ্রমিক) চইলা যায়| আমি কিছুক্ষণ দাড়াই থাকার পর অজ্ঞান হয়া যাই| এর পর আর কিছু কইতাম পাারিনা| বিকালবেলা দেখি আমি গ্রামরে একটি ফার্মেসিতে ঘুমাই আছি| আমারত সব শেষ| এখন এনজিওর কিস্তি দিমু কেমনে, আর পরিবার নিয়া সারা বছর কেমনে চলুম, এটা চিন্তা করলেই বুকের মধ্যে বেদনা (ব্যথা) করে|।
অপর কৃষক মো. মিজান মিয়া| তিনি শুষ্ক মৌসুমে অন্যের জমিতে শ্রমিকের কাজ করে পরিবার চালান| পৌতৃকভাবে পাওয়া ছয় বিঘা জমিতে ধান আবাদ করেছিলেন এবছর| সে জমি আবাদ করতে ব্রাক এনজিও থেকে প্রথমবার ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন| পরে আবারো ৫০ হাজার টাকা ঋণ নেন| গত সপ্তপাহে দুই বিঘা জমির ধান কাটতে পারছেন| কিন্তু টানা বৃষ্টির কারণে সেই ধানও পচে নষ্ট হয়ে গেছে| আর বাকি চার বিঘা জমি পানির নিচে তালিয়ে গেছে| তার দুই ছেলে দুই মেয়ে| এরমধ্যে তিন জন অষ্ট্রগ্রামের বাঙ্গালপাড়া আলিয়া মাদ্রাসায় পড়ালেখা করে| আর ছোট ছেলে সোনাতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থী|
কথা হলে মিজানের স্ত্রী নাসরিন আক্তার বলেন, আমার স্বামীর বুকে খুব ব্যাথা| কথা বলতে পারেনা ঠিকমত| গত শনিবারে জমি কাটতে গেছিন| ধান পানির নিচে দেইখ্যা অজ্ঞান হয়ে যায়| কামলা (শ্রমিক) বেডাইন বাড়িতে দিয়া গেছে| অষ্ট্রগামে নিয়া চিকিৎসা করাই আনছি| ধানও পানির নিচে জামাইও অসুস্থ| এখন পরিবার নিয়া কই যামু?
এদিকে কৃষকের মৃত্যুর একদিন পর রোববার দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের স্থানীয় এমপি এম এ হান্নান ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান| নিহতের পরিবারের কাছে নগদ টাকা, নতুন জামা-কাপড় ও শুকনো খাবার তুলে দেন| পরিবারের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করে এমপি এম এ হান্নান বলেন, আমাদের কৃষি মন্ত্রী একাধিকবার ফোন করে নিহত কৃষকের পরিবারের খোঁজ খবর নিয়েছেন| তাঁর মন্ত্রণালয় থেকে ওই পরিবারকে কিভাবে সহযোগীতা করা যায় সে বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি| ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীনা নাছরিন, কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসাইন| ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কে এম বশির উদ্দিন তুহিন।
সরেজমিন গত শনিবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত হাওরে গিয়ে দেখা গেছে, কৃষকরা কোথাও নৌকা নিয়ে আবার কোথাও কৃষক বোক সমান পানিতে নেমে ধান কাটছেন| কেউ কেউ বৃষ্টিতে ভিজে জমি থেকে ধান কেটে মাথায় বোঝাই করে খলায় রাখছেন| খলায় সেই ধনের স্তূপ| সবাই বৃষ্টির পানিতে ভিজে পচে যাবার উপক্রম ˆতরি হয়েছে| কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কেবল গোয়ালনগর ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামের গুরুহাজা, কাতলাপুর, দলিয়াবিল, সেতারি বিল, মধ্যকান্দা বিল, পুরাকান্দা বিল, নেলিখ্যা বিল, খারি বিলে প্রায় ৫০০ বিঘা পাকা ধান তলিয়ে গেছে| একই ইউনিয়নের ঝামারবালি গ্রামের খাসের চর, বলাচর, বন্দের বিল, দক্ষিণ চরে ৪০০ বিঘা ধান তলিয়ে গেছে| এছাড়াও কদমতলী গ্রামের কয়েকটি বিল বা হাওরে ৩০০ থেকে ৪০০ বিঘা জমি তলিয়ে গেছে|
গোয়ালনগর গ্রামের কৃষক খলিল মিয়া বলেন, ১০ কানি (৩০ শতকে এক কানি) জমিতে ধান করছি| দুই কানি জমির ধান কাইটা খলায় শুকানোর জন্য রাখছি| বৃষ্টিতে সেই ধানও পইচ্যা নীল হইয়া গেছে| বাকি আট কানি জমির ধান পানির নিচে তলাই গেছে| এই ধান আর তোলা যাবে না|
কৃষক নাসির মিয়া বলেন, আমার সব সম্পদ তলাইয়া গেছে| পুলাপাইন লইয়া কেমনে দিন কাটামু এই অবস্থা নাই| ১৫ কানি খেত পানির নিচে| রাতে ঘুম আসেনা ধানের চিন্তায়| কিছু ধান কাটছিলাম কিন্তু সেই ধানেও গেরা আইয়া পড়ছে, কিছু ধান খলায় পচতাছে|
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, নাসিরনগরে ১৭ হাজার ৯৮২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে| ৫৫ হাজার কৃষক ধান আবাদ করেছেন| গত সপ্তাহের প্রথম দিকে আকষ্মিক পাহাড়ি ঢলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার প্রায় ৩০০ হেক্টর জমির পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়| পরে টানা বৃষ্টির কারণে আরও ৩৫০ হেক্টর জমির পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়| এতে দুই থেকে আড়াই হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন| মোট ক্ষতি প্রায় চার হাজার মেট্রিক টন ধান| টাকার অংকে যার বাজার মূল্য ১৩ কোটি উনচল্লিশ লক্ষ বিশ হাজার টাকা| তবে স্থানীয় কৃষকের দাবি, ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি| গত বৃহস্পতিবারে উপজেলা কৃষি কার্যালয় থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের নামের তালিকা ˆতরি করলেও গোয়ালনগর ইউনিয়নের অধিকাংশ কৃষকই তালিকায় নাম ওঠেনি|
কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসাইনের ভাষ্য, দুই ঘন্টার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা দিতে নির্দেশ দেওয়ায় সব এলাকায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি| ২০০ কৃষকের নাম প্রাথমিকভাবে পাঠানো হয়েছে| তবে ক্ষতিগ্রস্ত কোন কৃষকের নামই বাদ পড়বে না| আগামী মৌসুমের ফসল ঘরে উঠা না পর্যন্ত মানবিক সাহায্য হিসেবে নগদ তিন হাজার ও ৬০ কেজি চাল প্রতি মাসে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে দেওয়া হবে|
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীনা নাছরিন বলেন, আমাদের এমপি মহোদয় ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত আহাদ মিয়ার পরিবারের কাছে প্রয়োজনীয় নগদ টাকা ও খাবার পেীঁছে দেওয়া হয়েছে| আমরা ঘটনাস্থলে সরেজমিন গিয়ে তার পরিবারের সাথে কথা বলেছি| পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত সকল কৃষককে সরকারি প্রণোদনার আওতায় আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে|





