পরীক্ষায় পাসের বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের সাথে যৌন হয়রানির অভিযোগ, উত্তাল মাদ্রাসা।

প্রথম ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিবেদক

নির্বাচনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করা ও বেশি নম্বর দেওয়ার প্রলোভনে একাধিক ছাত্রীকে যৌন সম্পর্কে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার চাপরতলা ইউনিয়নের একটি মাদ্রাসার সুপারের বিরুদ্ধে। অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা মানববন্ধন করেছেন।


সোমবার (১৫ ডিসেম্ভর) দুপুরে নাসিরনগর উপজেলার চাপরতলা ইউনিয়নের খান্দুরা ইসলাময়িা আলিয়া মাদ্রাসার সামনে নাসিরনগর-হবিগঞ্জ সড়কে এ মানববন্ধ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। 
অভিযুক্ত ওই সুপারের নাম মো. জহিরুল ইসলাম। তিনি মাদ্রাসার আরবি বিষয়ের শিক্ষক ও দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচনী পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেওয়ার কথা বলে শত শত নারী শিক্ষার্থীদের ফাঁদে ফেলে যৌন সম্পর্ক গড়ে তুলতে বাধ্য করা হতো। এমনকি যারা এসব ফাঁদ এড়িয়ে গেছে তাদের বার বার পরীক্ষায় ফেল করানো হয়েছে। এসব ঘটনায় ওই এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। এরই মধ্যে মাদ্রাসার প্রধানের বিভিন্ন অনিয়ম ও শিক্ষার্থীসহ এলাকার প্রবাসীদের স্ত্রীদের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করে যৌন নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। 
মাদ্রাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুবর্না আক্তার অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচনী পরীক্ষায় আমাদের উত্তীর্ণ করে বেশি নম্বর দেওয়ার কথা বলে যৌন সম্পর্কের প্রস্তাব দিতো। 


একই শ্রেণির শিক্ষার্থী সাকিবা আক্তার বলেন, হুজুর আমাদের শরীরে হাত দেয়। নির্বাচনী পরীক্ষা না দিয়েই  আমাদের দাখিল পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিবেন বলে কুপ্রস্তাব দিত। বিনিময়ে আমরা হুজুরের সাথে বিভিন্ন হোটেলে যেতে হবে।
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার বলেন, হুজুর যা করছে সেটা বলার মতো ভাষা আমাদের নেই। আমরা এখন খুবই আতঙ্কিত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদ্রাসার নারী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি এলাকার প্রবাসীদের স্ত্রীদের সঙ্গেও অনৈতিক সম্পর্কের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।
মানববন্ধনে শিক্ষকরা অভিযোগ করে বলেন, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাব নেই। ভর্তি পরীক্ষা, বেতদন, রেজিসেস্ট্রশন, ফরম ফিলাপ, প্রবেশপত্রসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ৬ লাখ ১৩ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি টিউশন ফি, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গরীব তহবিলের টাকাও ভোগ করা হয়েছে বলে মানববন্ধনে দাবি করনে শিক্ষকরা।
তাঁরা আরো বলেন, নিয়োগ সংক্রান্ত কাগজে স্বাক্ষর জালিয়াতি, শিক্ষকদের মূল সার্টিফিকেট জিম্মি করে রাখা ও নষ্ট করার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবাদ করলেই গালিগালাজ ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে তাদের।
যা পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে অনিয়মের সকল টাকা ফেরত ও সার্টিফিকেট নিজ দায়িত্বে তুলে দেওয়ার অঙ্গীকার করেন মাদ্রাসা সুপার মো. জহিরুল ইসলাম।
ইউপি সদস্য ও পরিচালনা কমিটির অভিভাবক সদস্য রুবেল মিয়া বলেন, সুপার জহিরুল ইসলাম নিয়মিত মাদ্রাসায় আসেন না। উপজেলায় কাজ আছে বলে তিনি হবিগঞ্জে নিজ বাসায় থাকেন, পরে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন। একবার উপজেলা শিক্ষা অফিসার পরিদর্শনে এসে তাকে না পেয়ে হাজিরা খাতায় লাল দাগ দিয়ে যান। তিনি আরো বলেন সুপারের এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ড, নির্যাতন ও দুর্নীতির হাত থেকে বাঁচতে শিক্ষক-কর্মচারীরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ ও সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন।
বাংলা বিষয়ের শিক্ষক নিলুফা আক্তার বলেন, বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীরা আমার কাছে এসে অভিযোগ দিতো হুজুরের খারাপ প্রস্তাবের বিষয়ে। এসব বিষয়ে কথা বলায় আমাদের মূল সার্টিফিকেট নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। 
শিক্ষক মো. মহিবুল ইসলাম  বলেন, হুজুরের অনিয়ম নিয়ে কথা বলায় আমাকে একাধিকবার মারধর করা হয়েছে। এসব কথা আর মুখে বলতে চাইনা।
মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির সভাপতি সৈয়দ সোহেল আবদাল বলেন, হুজুরের বিরুদ্ধে সকল অভিযোগ আমরা ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে লিখিত ও মৌখিকভাবে শুনেছি। তাঁর বিরুদ্ধে সকল অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জীবন ভট্টাচার্য বলেন, আমরা অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীনা নাসরিন বলেন, শিক্ষকরা একটি অভিযোগ দিয়েছিলো। পর তারাই অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয়। ছাত্রীদের যৌন হয়রানির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



শেয়ার করুন